
অ্যাপল কর্মকর্তা পদত্যাগ!
অ্যাপল কর্মকর্তা পদত্যাগ;বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তি বাজারে অ্যাপল (Apple) একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘকাল ধরে শীর্ষস্থান ধরে রাখার পর যদিও সাময়িকভাবে তারা এনভিডিয়ার (NVIDIA) পেছনে পড়েছে, তবুও ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজারমূল্য নিয়ে কোম্পানিটি যেকোনো সময় আবার প্রথম স্থানে ফিরে আসতে পারে। পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে আইফোন (iPhone) আবারও অ্যান্ড্রয়েডকে বিক্রির দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি, আইফোন ১৬-এর চারটি সংস্করণ বিশ্বব্যাপী সেরা ১০ স্মার্টফোন তালিকার প্রথম চারটি স্থান দখল করেছে।
তবে, সাফল্যের এই আকাশছোঁয়া মুহূর্তেও অ্যাপলের ভেতরের চিত্রটি কি পুরোপুরি শান্ত? সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার একের পর এক পদত্যাগের খবর কিন্তু সেই প্রশ্নই জোরালো করছে।
প্রশ্ন: সাফল্যের পরেও কেন এই প্রস্থান?
সাধারণত, যখন কোনো কোম্পানি বাজার ও বিক্রির দিক থেকে সর্বোচ্চ শিখরে থাকে, তখন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তারা সহজে ছেড়ে যেতে চান না। অ্যাপলের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিক পদত্যাগ বা রদবদল তাই কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ: সম্প্রতি মেশিন লার্নিং ও এআই বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন গিয়ানান্দ্রেয়া পদত্যাগ করেছেন। এই সময়ে তার চলে যাওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স (Apple Intelligence) বাজারে গুগল জেমিনাইয়ের (Google Gemini) তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছে এবং মেটা (Meta) অ্যাপলের এআই বিশেষজ্ঞদের নিজেদের দিকে টানছে। তবে, তার স্থানে এসেছেন অমর সুব্রামানিয়া, যিনি ২০২৩ সালে গুগল জেমিনাই তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং মাইক্রোসফটেও এআই দলে কাজ করেছেন। তার এই নিয়োগ টিম কুকের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাই প্রকাশ করে, যদিও একজন শীর্ষ কর্মকর্তার প্রস্থান তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
২. ডিজাইন প্রধানের বিদায় ও নতুন দিগন্ত: এরপরই ডিজাইন প্রধান অ্যালান ডাইয়ের চাকরি ছাড়ার খবর আসে। ‘লিকুইড গ্লাস’-এর মতো বিতর্কিত ও প্রশংসিত ডিজাইনের স্রষ্টা ডাই এখন মেটা-তে যোগ দিচ্ছেন। ব্লুমবার্গের মার্ক গুরমানের মতে, এটি অ্যাপলের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তার জায়গায় এসেছেন স্টিফেন লেমে, যাকে নিয়ে অ্যাপল কর্মীরা যথেষ্ট আশাবাদী।
৩. সিইও টিম কুককে ঘিরে অবসরের জল্পনা: এই রদবদলের আবহে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুককে (Tim Cook) ঘিরে অবসরের গুঞ্জন তীব্র হয়েছে। ২০১১ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিকে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে আসা এই নেতা ২০২৬ সালের মধ্যে সরে যেতে পারেন বলে জল্পনা। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেননি। ধারণা করা হচ্ছে, হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট জন টারনাস তার উত্তরসূরি হতে পারেন, যিনি ২৪ বছর ধরে অ্যাপলের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রায় সব আইফোন ও আইপ্যাডের নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এছাড়াও, জেনারেল কাউন্সেল কেট অ্যাডামস ও লিসা জ্যাকসনও অবসরে যাচ্ছেন। তবে চিপ প্রধান জনি স্রুজি কর্মীদের আশ্বস্ত করেছেন যে তার এখনই চলে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
স্থিতিশীলতার ভিন্ন চিত্র
বাইরের দিক থেকে দেখলে এই পদত্যাগ ও নেতৃত্ব পরিবর্তনকে কিছুটা অস্থিরতা মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, অ্যাপল এখনও অত্যন্ত স্থিতিশীল। আইফোন বিক্রি বাড়ছে, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন অব্যাহত আছে, এবং নেতৃত্ব বদলের প্রক্রিয়াটি বেশ সুপরিকল্পিতভাবেই চলছে। নতুন এআই প্রধানের আগমন অ্যাপলের ভবিষ্যৎ কৌশলকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই ধারণা।
আসলে, এই ঘটনাপ্রবাহ অ্যাপলের স্থিতিশীলতার একটি নতুন দিক তুলে ধরে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টিম কুকের নেতৃত্বে যে মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন একজন বা দু’জন কর্মকর্তার প্রস্থানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। অ্যাপলের পুরোনো একটি স্লোগানের মতোই, “সবকিছু বুঝতে হলে, একটু অন্যভাবে ভাবতে হয়”—এই পালাবদল হয়তো ভবিষ্যতের আরও বড় উদ্ভাবন ও সাফল্যের পথ খুলে দিচ্ছে।


