
নজিরবিহীন নির্মাণ: নরওয়ের সাগরতলে বিশ্বের দীর্ঘতম ও গভীরতম সড়ক ‘রোগফাস্ট’
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ [bdnewsnetwork.com]
ইউরোপের নর্ডিক রাষ্ট্র নরওয়েতে এমন এক প্রকৌশলগত বিস্ময় তৈরি হচ্ছে, যা বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। দেশটি নির্মাণ করছে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মহাসাগ্রিক সুড়ঙ্গ সড়ক, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে ১ হাজার ২৮৬ ফুট (৩৯২ মিটার) গভীরতায় বিস্তৃত হবে। নির্মাণকাজ শেষ হলে এটিই হবে সাগরতলে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর সড়কপথ, যা পশ্চিম নরওয়ের পরিবহন ব্যবস্থায় বিপ্লব আনবে।
️ ‘রোগফাস্ট’ প্রকল্প: এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ
এই মেগা প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রোগফাস্ট’ (Rogfast)। এটি মূলত একটি সাবসি টানেল, যা নরওয়ের গুরুত্বপূর্ণ শহর স্ট্যাভানগার এবং বার্জেনকে সরাসরি সংযুক্ত করবে। বর্তমানে এই দুই শহরের মধ্যে যাতায়াতের জন্য ফেরির প্রয়োজন হয় এবং এতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। রোগফাস্ট চালু হলে ফেরি নির্ভরতা দূর হবে এবং ভ্রমণের সময় ৪০ মিনিট পর্যন্ত কমবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রথমে ২০১৮ সালে এই উচ্চাভিলাষী নির্মাণকাজ শুরু হলেও, খরচ বৃদ্ধির কারণে এক বছরের মাথায় তা স্থগিত করা হয়েছিল। তবে ২০২১ সালে নতুন করে কাজ শুরু হয়। সব ঠিকঠাক থাকলে ২০৩৩ সালের মধ্যে এই ঐতিহাসিক সড়কপথটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর নির্মাণে মোট ২৪০ কোটি ডলারের বিশাল বাজেট প্রয়োজন হবে।
️ প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবন
বহুজাতিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান স্কানস্কা (Skanska) এই বিশাল কর্মযজ্ঞের উত্তরের অংশ নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প পরিচালক অ্যান ব্রিট মোয়েন উল্লেখ করেছেন, এই সড়ক শুধুমাত্র ভ্রমণ সময় কমাবে না, বরং পশ্চিম উপকূলের যোগাযোগ অবকাঠামোয় এক আমূল পরিবর্তন আনবে।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে গভীর সুড়ঙ্গ নির্মাণের এই পথে চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। প্রকৌশলীরা যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটার নিচে কাজ করছেন, তখন বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশ একটি বড় সমস্যা। সর্বোচ্চ গভীরতা ৩৯২ মিটারে পৌঁছালে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বদ্ধ পরিবেশে শ্রমিকদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা। এত গভীরে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা এক বিশাল কারিগরি জটিলতা। এই সমস্যা সমাধানে বিশেষ ধরনের শক্তিশালী ভেন্টিলেশন সিস্টেম বা বায়ু চলাচলের নকশা তৈরি ও স্থাপন করা হচ্ছে, যা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুড়ঙ্গের দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করবে।
বিশ্বের অন্যান্য সুড়ঙ্গের সাথে তুলনা
যদিও দৈর্ঘ্যের দিক থেকে রোগফাস্ট বিশ্বের দীর্ঘতম সাবসি টানেল নয়, তবে গভীরতার দিক থেকে এটি অন্য সব সুড়ঙ্গকে পেছনে ফেলবে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ হলো জাপানের উত্তরাঞ্চলের সেইকান টানেল (Seikan Tunnel), যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৪ কিলোমিটার এবং সাগরতলের অংশ ২৩ কিলোমিটারের বেশি। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে যুক্ত করা দ্য চ্যানেল টানেলের (The Channel Tunnel) ৩৮ কিলোমিটার অংশ সাগরতলে অবস্থিত। এই দুটি টানেলই মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং কোনোটিরই গভীরতা নরওয়ের রোগফাস্টের ধারেকাছে নেই। রোগফাস্টই হবে বিশ্বের একমাত্র সাবসি টানেল যা এই অভূতপূর্ব গভীরতায় সড়ক পরিবহন সুবিধা দেবে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এই প্রকল্পের মাধ্যমে একাধারে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তেমনি সাগরতলের সড়ক তত্ত্বাবধানের জন্য ভবিষ্যতের নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হবে। যদিও ফেরি চলাচল বন্ধ হওয়ায় কিছু মানুষ কাজ হারাতে পারেন, তবে সড়ক সংযোগ উন্নত হওয়ায় তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে। রোগফাস্ট শুধুমাত্র নরওয়ের প্রকৌশলগত দক্ষতার প্রতীক নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে যাচ্ছে।


