
উখিয়া হত্যাকাণ্ড
bdnewsnetwork.com
এক দশকে তিন সন্তানের নিথর দেহ! মনখালী গ্রামে সুবিচারের দীর্ঘশ্বাস
উখিয়া হত্যাকাণ্ড; কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মনখালী গ্রামে যেন নেমে এসেছে এক অভিশাপ। ভোটের রাজনীতির নির্মম বলি হয়েছেন একই পরিবারের তিন সন্তান। একে একে তিন ছেলেকে হারিয়ে এখন শোকে পাথর বৃদ্ধা মা গোলজার বেগম (৬৬)। সর্বশেষ ইউপি সদস্য ছেলে কামাল হোসাইন হত্যার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবারটি ভুগছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
মনখালী গ্রামের বটতলী পরিবার কল্যাণকেন্দ্রের পাশেই ছিদ্দিক মেম্বারের পুরোনো ভিটেবাড়ি। ১১ ডিসেম্বরের দুপুরে সেই বাড়ি থেকেই ভেসে আসছিল এক বুকফাটা বিলাপ— “আঁর পোয়া কামাল, জসিম আর জিয়ারে আনি দ’ (এনে দাও), নইলে আঁই হারে (কারে) লই বাঁইচ্ছুইম।”
স্বামীর মৃত্যুর পর চার ছেলে আর তিন মেয়েকে নিয়ে গোলজার বেগমের নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় ভোটের রাজনীতি তাঁর সেই সংসারকে দশ বছরের মধ্যে তছনছ করে দিয়েছে। নিহত তিন ছেলের বাঁধাই করা ছবি বুকে নিয়ে অসুস্থ এই বৃদ্ধা মা কেবলই সুবিচারের প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন।
রাজনীতিতে শুরু, রাজনীতিতে শেষ
নিহত তিনজনের বাবা ছিদ্দিক আহমদ ছিলেন এলাকার নির্বাচিত ইউপি সদস্য। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে কামাল হোসাইন (৪২) দুবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের বিরোধই এই তিন হত্যার মূল কারণ বলে মনে করে পরিবার ও স্থানীয়রা।
-
প্রথম বলি: ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মেজ ছেলে জিয়া উদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তবে পরিবারের দাবি, এটি ছিল নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
-
দ্বিতীয় বলি: ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই বড় ছেলে জসিম উদ্দিনকে হত্যা করে মেরিন ড্রাইভের সাগর পাড়ে ফেলে রাখা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করেন জসিমের ছোট ভাই সাহাব উদ্দিন।
-
সর্বশেষ বলি: ২০২৩ সালের ৮ জুলাই ইউপি সদস্য কামাল হোসাইনের মরদেহ মনখালী গ্রামের একটি খাল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায়ও সাহাব উদ্দিন বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
⚖️ আসামি জামিনে, পরিবার নিরাপত্তাহীনতায়
কামাল হত্যার পর স্থানীয় জনসাধারণ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করলেও এখন পর্যন্ত মামলার মূল আসামিরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উখিয়া থানার এসআই দুর্জয় সরকার প্রথম আলোকে জানান, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তার করাও সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
জেলা ডিবির পরিদর্শক ইমন চৌধুরী জানিয়েছেন, তদন্তে অগ্রগতি হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। তিনি আরও বলেন, মামলার সব আসামি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন, যে কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।
বিচার কি হবে না?
নিহত কামালের ভাগনে আকিল রানা জানান, ২০১৭-১৮ সালের ইউপি সদস্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাই সুলতান আহমদ ও জহুর আহমদের পরিবারের সঙ্গে কামালের পরিবারের বিরোধ শুরু হয়। এই বিরোধের জেরেই একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
এদিকে, ১৫ দিন পর মাকে নিয়ে ওঠার কথা ছিল নতুন পাকা বাড়িতে। সাত মাস আগে ঘরের একটি অংশ ভেঙে সেই নতুন ছাদ নির্মাণ করেছিলেন নিহত কামাল। কিন্তু তার আগেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে লাশ গুম করে। বাড়িতে এখন পুরুষ বলতে কেউ নেই। শুধু নারী আর শিশুরা। এই পরিস্থিতিতে খুনিদের অবাধ বিচরণ এবং সুবিচার না পাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতার চরম উদ্বেগে দিন কাটছে গোলজার বেগমের পরিবারের। তারা তাকিয়ে আছে রাষ্ট্রের দিকে, যেন এই তিন সন্তানের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হয়।

