
বন্য হাতির আক্রমণ
শোকের ছায়া: হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল এক যুবকের, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস
স্টাফ রিপোর্টার, বিডি নিউজ নেটওয়ার্ক নালিতাবাড়ী, শেরপুর প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় আবারও বন্য হাতির তাণ্ডবের শিকার হলেন এক নিরীহ যুবক। গত সোমবার বিকেলে বালিজুড়ি রেঞ্জের মালাকুচা এলাকার ঘন জঙ্গলে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে ফারুক হোসেন (৩৬) নামের ওই যুবকের করুণ মৃত্যু হয়। তিনি পার্শ্ববর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার ফাকরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কৌতূহল না বিপর্যয়? হাতির কাছাকাছি যাওয়াই কাল হলো
বন বিভাগ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি বন্য হাতির একটি বিশাল দল, যার মধ্যে ৬-৭টি শাবকও রয়েছে, শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ি রেঞ্জের মালাকুচা জঙ্গলে অবস্থান করছে। স্থানীয়রা প্রায়শই কৌতূহলবশত এই হাতিদের গতিবিধি দেখতে পাহাড়ি এলাকায় ভিড় করে।
সোমবার বিকেলে নিহত ফারুক হোসেনও হাতির দল দেখতেই ওই পাহাড়ি এলাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার গুরুত্ব ভুলে গিয়ে তিনি হঠাৎ করেই একটি হাতির একেবারে সামনে পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যেই আক্রমণ করে বসে সেই হাতিটি। বয়সে তরুণ, তেজে চঞ্চল হাতিটি তাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে মাটিতে আছাড় মারে এবং পরে পায়ের নিচে পিষ্ট করে গুরুতরভাবে আহত করে। বন্য হাতির এই আকস্মিক ও ভয়াবহ আক্রমণে ফারুকের বাঁচার কোনো সুযোগই ছিল না।
উদ্ধার প্রচেষ্টা ও মৃত্যুর ঘোষণা: প্রশাসন কী বলছে?
খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং গুরুতর আহত অবস্থায় ফারুক হোসেনকে উদ্ধার করে শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই তারা ফারুক হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই প্রসঙ্গে বন বিভাগের বালিজুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “সীমান্ত এলাকায় ৪০–৪২টি বন্য হাতি অবস্থান করছে। সোমবার বিকেলে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বন্য হাতির কারণে সৃষ্ট এই ক্ষয়ক্ষতির জন্য নিহত ব্যক্তির পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ বিষয়ে বন বিভাগের কাছে আবেদন করার জন্য নিহতের পরিবারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে, শ্রীবরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নুরুল আলম জানিয়েছেন, নিহত যুবকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। মানবিকতার সঙ্গে তার লাশ স্বজনদের কাছে দ্রুত হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। আইনগতভাবে এ বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়ের করা হবে।
মানুষ-হাতি সংঘাত: কেন বারবার এমন মর্মান্তিক পরিণতি?
এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল যে শেরপুরের গারো পাহাড় সংলগ্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে মানুষ এবং বন্য হাতির মধ্যে সংঘাত এখন এক কঠিন বাস্তবতা। বনভূমি উজাড় এবং মানুষের বসতি বৃদ্ধির কারণে বন্য হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ (করিডোর) সংকীর্ণ হচ্ছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে হাতিরা প্রতিনিয়ত লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা প্রায়শই এমন ভয়াবহ পরিণতির জন্ম দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ দিলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি, বন বিভাগের কার্যকর টহল, এবং হাতির নিরাপদ বিচরণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই পারে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু ঠেকানোর একমাত্র উপায়। প্রশাসনের উচিত, এই অঞ্চলে মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে আরও দ্রুত এবং টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া। পাহাড় ও বনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত করা এখন সময়ের দাবি। ফারুক হোসেনের এই মৃত্যু আমাদের সকলের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।


