
লিবিয়া উপকূলে ২৬ বাংলাদেশি সহ নৌকাডুবি: ৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, অভিবাসী সংকট আরও গভীর
আল-জাজিরা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সূত্রে:[bdnewsnetwork.com]
আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২৫
লিবিয়ার উপকূলে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বহনকারী দুটি নৌকা ডুবে যাওয়ার ফলে কমপক্ষে চারজন বাংলাদেশি আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টারত অভিবাসীদের জীবনের ঝুঁকি এবং চলমান মানবিক সংকটকে আবারও সামনে এনেছে। লিবীয় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এক বিবৃতিতে এই হতাহতের খবর নিশ্চিত করেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে উপকূলীয় শহর আল-খুমসের কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১১৮ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত আল-খুমস, ইউরোপগামী অভিবাসীদের জন্য একটি প্রধান লঞ্চিং পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত।
প্রথম নৌকাটিতে ২৬ জন বাংলাদেশি আরোহী
রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম নৌকাটিতে মোট ২৬ জন আরোহী ছিলেন, যারা সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। এই নৌকাডুবির ঘটনায় অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁদের মধ্যে চারজনের জীবনহানি ঘটেছে। যদিও বাকি আরোহীদের ভাগ্য সম্পর্কে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি, তবে উদ্ধারকারী দল দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।
লিবীয় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মীদের তোলা ছবিতে দেখা যায়, প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো মৃতদেহগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে। অন্য ছবিগুলোতে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং কেউ কেউ কম্বল জড়িয়ে মাটিতে বসে আছেন—যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরে। উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং আল-খুমস পোর্ট সিকিউরিটি এজেন্সি যৌথভাবে এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। শহরের সরকারি কৌঁসুলির নির্দেশে মৃতদেহগুলো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দ্বিতীয় নৌকায় ৬৯ জন, যার মধ্যে ছিল ৮ শিশু
একই রাতে ডুবে যাওয়া দ্বিতীয় নৌকাটিতে মোট ৬৯ জন আরোহী ছিলেন। এই যাত্রীদের মধ্যে দুজন মিসরীয় এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুদানি নাগরিক ছিলেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নৌকাটিতে আটটি শিশুও ছিল। দ্বিতীয় নৌকাটির আরোহীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে রেড ক্রিসেন্টের বিবৃতিতে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই, যা তাদের পরিবারের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
লিবিয়া: অভিবাসীদের প্রধান ট্রানজিট রুট
২০১১ সালে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো-সমর্থিত আন্দোলনের মাধ্যমে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হওয়ার পর থেকেই দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং ব্যাপক দারিদ্র্যের কবলে পড়ে। এই সুযোগে লিবিয়া যুদ্ধ ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে ইউরোপে উন্নত জীবনের সন্ধানে যাওয়া অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার একটি প্রধান ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। মানব পাচারকারীরা এই দুর্বল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রায়শই অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা ব্যবহার করে, যার ফলে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো নিয়মিত ঘটছে।
নিয়মিত দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) সম্প্রতি এই রুটে অভিবাসীদের ব্যাপক প্রাণহানির একাধিক তথ্য জানিয়েছে। গত বুধবার আইওএম জানায়, আল বুরি তেলক্ষেত্রের কাছে একটি রাবারের নৌকা ডুবে কমপক্ষে ৪২ জন অভিবাসী নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মৃত বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগেও অক্টোবরের মাঝামাঝি ত্রিপোলির পশ্চিম উপকূলে ৬১ জন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে সুদানের ৭৫ জন শরণার্থী বহনকারী একটি নৌকায় আগুন লাগার পর অন্তত ৫০ জন মারা যান।
এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইউরোপগামী এই অভিবাসন রুটটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক পথ হিসেবে রয়ে গেছে। ভূমধ্যসাগরের এই অংশটি অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। বাংলাদেশ সহ আন্তর্জাতিক মহল থেকে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথের ব্যবস্থা করার দাবি জোরদার হচ্ছে।


