মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিন বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যু, স্বপ্ন ভেঙেছে ৩ পরিবারের

প্রকাশিত: 1:02 PM, December 4, 2025

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিন বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যু, স্বপ্ন ভেঙেছে ৩ পরিবারের

‘একটাই মাত্র ছেলে আমার, সব শেষ হয়ে গেল’

Boshir Ahmed নোয়াখালী প্রতিনিধি [bdnewsnetwork.com]

নোয়াখালীর চাটখিলে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বদলকোট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হাসিবুল ইসলাম (১৬), সফিকুল ইসলাম (১৬) ও মো. রায়হান (১৬)—এই তিন বন্ধু ছিলেন একই ক্লাসের ছাত্র এবং একই গ্রামের বাসিন্দা। তাদের এই আকস্মিক প্রয়াণে তিনটি পরিবারে এখন শুধু কান্নার রোল। এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলল কিশোর বয়সে বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানো এবং সড়কে নিরাপত্তার বিষয়ে।

যেভাবে ঘটল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র জানা যায়, গত সোমবার রাতে বদলকোট উচ্চবিদ্যালয়ের মাধ্যমিক (এসএসসি) নির্বাচনী পরীক্ষার্থী চার বন্ধু হাসিবুল ইসলাম, সফিকুল ইসলাম, মো. রায়হান ও হাবিবুর রহমান হাসিবুলের বাবার মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়। একপর্যায়ে হাসিবুল বেপরোয়াভাবে বাইক চালাচ্ছিল।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া হাবিবুর রহমান জানান, দ্রুতগতিতে চলতে থাকা মোটরসাইকেলটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা বাম দিকের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। ধাক্কার তীব্রতায় মোটরসাইকেল উল্টে যায় এবং হাসিবুল, সফিকুল ও রায়হান গাছের ওপর ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। কিন্তু হাবিবুর সড়কে পড়ে যাওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম আঘাত পান।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ওই দিন রাতেই হাসিবুল ইসলাম মারা যায়। এরপর মঙ্গলবার সারাদিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গতকাল, বুধবার সকালে সফিকুল ইসলাম ও মো. রায়হানেরও মৃত্যু হয়।

স্বপ্ন ভেঙে খানখান, শোকে কাতর স্বজনেরা

নিহত সফিকুল ইসলামের মা রিমা আক্তার (৩৫)-এর বিলাপে ভারী হয়ে উঠেছে মধ্য বদলকোট গ্রামের আকাশ। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার একটাই মাত্র ছেলে ছিল। ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল—পড়ালেখা করবে, ভালো চাকরি করবে, পরিবারের হাল ধরবে; কিন্তু সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। এখন আমি কীভাবে বাঁচব, আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে তিনি জানান, সফিকুল তাঁকে চা খেয়ে আসার কথা বলেই বেরিয়েছিল। এরপর আর কোনো খবর পাননি, শুধু দুর্ঘটনার খবর পান।

একইভাবে পুত্রহারা হয়েছেন হাসিবুলের বাবা হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘সোমবার পরীক্ষা দিয়ে এসে সন্ধ্যায় বন্ধুদের নিয়ে বের হয়েছিল। রাত ৯টার পর খবর পাই ছেলে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। ছুটে গিয়ে দেখি ছেলে ততক্ষণে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। না-পারলাম কথা বলতে, না-পারলাম কোলে নিতে।’

বইগুলো টেবিলে, নেই শুধু তারা

নিহত হাসিবুলের ঘরে ঢুকলে এখনো দেখা যায় পড়ার টেবিলটি। বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের সারি সারি বই সাজানো আছে নিচের তাকে। টেবিলে খোলা পড়ে আছে দু-তিনটি খাতা—যা প্রমাণ করে বাজার থেকে ফিরে হাসিবুল আবার পড়তে বসবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হবে না।

অন্য দুই বন্ধু মো. রায়হান ও সফিকুলের বাড়িতেও একই দৃশ্য। শোকের তীব্রতা কমাতে স্বজনেরা অবশ্য তাদের বই-খাতা সরিয়ে রেখেছেন। সন্তানদের পড়ার টেবিলে চোখ পড়তেই মা-বাবারা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নচিহ্ন

একসঙ্গে তিন কিশোর সহপাঠীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু এই গ্রামেই নয়, পুরো নোয়াখালীতে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছে। এই দুর্ঘটনা আবারও কিশোরদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া এবং তাদের বেপরোয়া গতির নেশা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলল। অভিভাবক এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির উচিত, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ করতে আরও কঠোর এবং সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া।