
জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা: কী ঘটবে নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও কূটনীতিতে?
জাতিসংঘ (United Nations – UN) প্রতিষ্ঠার পর প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেছে। এই বিশ্ব সংস্থাটি বৈশ্বিক সংঘাত নিরসন, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু গাজা বা ইউক্রেনের মতো চলমান আন্তর্জাতিক সংকটে এর কার্যকারিতা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন অনিবার্যভাবে প্রশ্ন জাগে—জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে বিশ্বজুড়ে কী হতে পারে? bdnewsnetwork.com এর এই বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতামতের ভিত্তিতে এর বহুমুখী প্রভাব তুলে ধরা হলো।
১. আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শূন্যতা
জাতিসংঘের বিলুপ্তি সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব নিরাপত্তার ওপর।
- নিরাপত্তা পরিষদের পতন: সংস্থাটি না থাকলে সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর (Veto Powers) মধ্যে আলোচনার মঞ্চ হিসেবে কাজ করা নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council) আর থাকবে না। এর ফলে বড় দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাবে।
- আইনের প্রয়োগের অভাব: আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তির তদারকি দুর্বল হয়ে যাবে। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে একতরফা পদক্ষেপ (Unilateral Actions) নিতে শুরু করবে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিধি-বিধানের কোনো তোয়াক্কা করা হবে না। এতে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
২. মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। এর অনুপস্থিতিতে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করবে:
- শরণার্থী ও অভিবাসী সংকট: UNHCR (শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন) এবং WFP (বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি) এর মতো সংস্থাগুলো প্রতি বছর দশ কোটি বা তারও বেশি শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের (Refugees and Displaced Persons) জীবন রক্ষা করে। এই সংস্থাগুলো বিলুপ্ত হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী আশ্রয়, খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হবে, যা বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন মানবিক সংকটে (Unprecedented Humanitarian Crisis) রূপ নেবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই শরণার্থীরা উন্নত বিশ্বের দিকে ধাবিত হবে, যা গ্লোবাল নর্থের (Global North) দেশগুলোতেও বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
- স্বাস্থ্যসেবার বিপর্যয়: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) না থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মহামারি মোকাবিলা (Pandemic Response), টিকাদান কর্মসূচি ও এইডসের মতো রোগের চিকিৎসায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে।
৩. বৈশ্বিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের সমাপ্তি
জাতিসংঘ বৈশ্বিক উন্নয়ন এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি।
- জলবায়ু ও পরিবেশ: ইউএনডিপি (UNDP) বা UNEP-এর মতো সংস্থা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা (Climate Change Mitigation) এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো আন্তঃদেশীয় চ্যালেঞ্জগুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে উঠবে।
- শান্তিরক্ষী মিশন বিলুপ্তি: বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী (UN Peacekeeping) না থাকলে সেইসব এলাকায় পুরোনো সংঘাতগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, ফলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শরণার্থী বিষয়ক গবেষক জেফ ক্রিসপের মতে, “আপনি যদি আগামীকাল জাতিসংঘ বিলুপ্ত করেন, তবে তার পরের দিনই বিশ্ব এর পুনর্গঠনের উপায় খুঁজতে শুরু করবে।” কারণ, বর্তমান বিশ্বের আন্তঃদেশীয় চ্যালেঞ্জগুলো একক রাষ্ট্রের পক্ষে মোকাবিলা করা অসম্ভব।
জাতিসংঘের দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, এর সম্পূর্ণ বিলুপ্তি বিশ্বকে এক অন্ধকার, অনিরাপদ ও চরম মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
আপনি কি মনে করেন জাতিসংঘকে বিলুপ্ত না করে এর কার্যকারিতা ও কাঠামো সংস্কার করা উচিত? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান।


