
️ কেন আমরা চোখ ঘষি এবং এর মারাত্মক ঝুঁকি: জেনে নিন সমাধান
bdnewsnetwork.com প্রকাশের তারিখ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫
ডা. হিমেল বিশ্বাস ক্লিনিক্যাল স্ট্যাফ, স্নায়ুরোগ বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।
আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জীবনে কোনো না কোনো সময় চোখ ঘষেছি। এই অভ্যাসটি যেন আমাদের একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে—তা সে ঘুম থেকে ওঠার পর হোক, দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ক্লান্তি দূর করতেই হোক, অথবা চোখে সামান্য অস্বস্তি অনুভব করার সময়। আপাতদৃষ্টিতে এই কাজটি অত্যন্ত নিরীহ এবং স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, আমাদের চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গের জন্য এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। কিন্তু কেন আমরা এই অভ্যাসটি করি এবং কেনই বা এটি আমাদের চোখের জন্য এত ক্ষতিকর, চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
কেন চোখ ঘষার প্রবণতা তৈরি হয়?
চোখ ঘষার পেছনে মূলত কয়েকটি সাধারণ কারণ লুকিয়ে থাকে:
১. শুষ্কতা ও ক্লান্তি: বর্তমানে ডিজিটাল ডিভাইসের অত্যধিক ব্যবহারের কারণে ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’ একটি সাধারণ সমস্যা। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক ফেলার হার কমে যায়, ফলে চোখ শুষ্ক ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক তখন এই অস্বস্তি দূর করতে ঘষার মাধ্যমে সাময়িক আরাম খোঁজে।
২. অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া: ধুলা, ফুলের পরাগ, পোষা প্রাণীর লোম বা অন্যান্য অ্যালার্জেনের কারণে চোখে তীব্র চুলকানি শুরু হয়। এই চুলকানির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আমরা অজান্তেই চোখ ঘষি, যা আসলে সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
৩. স্নায়বিক আরাম (Vagal Response): চোখ ঘষার সময় ভেগাস নার্ভ উদ্দীপ্ত হয়। এই উদ্দীপনা সাময়িকভাবে হৃৎস্পন্দন সামান্য হ্রাস করে, যা এক ধরনের তাৎক্ষণিক স্বস্তি বা আরামের অনুভূতি এনে দেয়। এটি মূলত আমাদের শরীরের একটি স্বতঃস্ফূর্ত স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া।
কেন চোখ ঘষা চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর? (দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি)
চোখ ঘষার অভ্যাসটি যদি দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে, তবে এর ফল মারাত্মক হতে পারে। এটি চোখের গঠন ও দৃষ্টিশক্তির উপর স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে:
১. সংক্রমণ এবং জীবাণুর প্রবেশ
হাত হলো অসংখ্য জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের আস্তানা। চোখ ঘষার সময় হাতের মাধ্যমে এই ক্ষতিকারক অণুজীবগুলো সরাসরি চোখে প্রবেশ করে। এর ফলে কনজাংটিভাইটিস (চোখ ওঠা), স্টাই (অঞ্জনী) বা অন্যান্য গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২. কর্নিয়ার স্থায়ী ক্ষতি: কেরাটোকোনাস
জোরে এবং নিয়মিত চোখ ঘষলে চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশ, যা কর্নিয়া নামে পরিচিত, তার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। নিয়মিত এই চাপ কর্নিয়ার অভ্যন্তরীণ কোলাজেন তন্তুগুলোকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে কর্নিয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক গোলাকার আকৃতি থেকে শঙ্কু আকৃতিতে (Cone Shape) বাইরের দিকে ঝুঁকে যায়। এই অবস্থাকে কেরাটোকোনাস বলা হয়। কেরাটোকোনাস একটি গুরুতর দৃষ্টিশক্তি-হ্রাসকারী রোগ, যার ফলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায় এবং চরম পর্যায়ে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
৩. গ্লুকোমার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং অপটিক নার্ভের ক্ষতি
যাঁরা ইতিমধ্যে গ্লুকোমা বা চোখের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের জন্য চোখ ঘষা অত্যন্ত বিপজ্জনক। চোখ ঘষার ফলে চোখের ভেতরের চাপ (Intraocular Pressure) হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। এই অতিরিক্ত চাপ অপটিক নার্ভের (যে স্নায়ু দৃষ্টিসংকেত মস্তিষ্কে বহন করে) স্থায়ী ক্ষতি করে। অপটিক নার্ভ একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে হারাতে পারে।
৪. অ্যালার্জি এবং চুলকানি আরও তীব্র হওয়া
অ্যালার্জির কারণে চোখ চুলকালে ঘষলে সাময়িক আরাম মনে হলেও, এটি আসলে সমস্যাটিকে আরও জটিল করে। ঘষার ফলে চোখের মধ্যে থাকা হিস্টামিন নিঃসরণকারী মাস্ট কোষগুলো (Mast Cells) থেকে আরও বেশি পরিমাণে হিস্টামিন নিঃসৃত হয়। এই অতিরিক্ত হিস্টামিন চুলকানি, লাল ভাব এবং ফোলা আরও বাড়িয়ে দেয়, যা একটি ক্ষতিকর চক্র তৈরি করে।
৫. চোখের চারপাশে কালচে ছোপ (ডার্ক সার্কেল)
চোখ এবং তার চারপাশের ত্বক শরীরের সবচেয়ে পাতলা এবং সংবেদনশীল অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জোরে ঘষলে এই অংশের রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ছিঁড়ে যেতে পারে। ফলে চোখের নিচে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে ছোপ বা ডার্ক সার্কেল আরও প্রকট হতে পারে।
এই ক্ষতিকর অভ্যাস দূর করার উপায়
চোখের মতো মূল্যবান অঙ্গের সুরক্ষার জন্য এই ক্ষতিকর অভ্যাসটি দ্রুত বর্জন করা আবশ্যক:
১. তাৎক্ষণিক প্রতিকার: চুলকানি বা অস্বস্তি অনুভব করলে ঘষার পরিবর্তে পরিষ্কার ঠান্ডা জল দিয়ে চোখের পাতায় আলতো করে ঝাপটা দিন। চোখে বরফ মোড়ানো কাপড় আলতো করে ধরে রাখলে সাময়িক আরাম পাওয়া যেতে পারে।
২. হাইড্রেশন এবং লুব্রিকেশন: যদি শুষ্কতার কারণে অস্বস্তি হয়, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী লুব্রিকেটিং আই ড্রপ বা কৃত্রিম অশ্রু (Artificial Tears) ব্যবহার করুন। এটি চোখকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করবে।
৩. অ্যালার্জেন এড়িয়ে চলুন: যদি অ্যালার্জির কারণে চুলকানি হয়, তবে অ্যালার্জেন (যেমন: ধুলা, পরাগ) থেকে দূরে থাকুন। প্রয়োজনে অ্যান্টিহিস্টামিন আই ড্রপ বা ওরাল মেডিসিনের জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৪. বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: যদি চোখ ঘষার প্রবণতা বা অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই দ্রুত একজন চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ, কেরাটোকোনাস বা গ্লুকোমার মতো কোনো অন্তর্নিহিত গুরুতর সমস্যা আছে কিনা, তা নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা আবশ্যক।
চোখ আমাদের অমূল্য সম্পদ। সামান্য অসাবধানতা বা একটি নিরীহ অভ্যাসও আমাদের দৃষ্টিশক্তির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। চোখ ঘষার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের চোখের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


