
কারা-চিকিৎসা সংকট: ৫ বছরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ২৭৫ বন্দীর মর্মান্তিক মৃত্যু
ভূমিকা: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৮২ হাজার বন্দী
[bdnewsnetwork.com]বাংলাদেশের ৭৪টি কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৮২ হাজার বন্দী আটক রয়েছেন, যা কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার (৪৬ হাজার) তুলনায় প্রায় ৭৮ শতাংশ বেশি। এই বিপুল সংখ্যক বন্দীর জন্য সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। চিকিৎসকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল এবং সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার কারণে অসুস্থ বন্দীরা সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না, যার ফলস্বরূপ বাড়ছে অকালমৃত্যুর সংখ্যা। এই ভয়াবহ চিকিৎসা সংকট দেশের কারা ব্যবস্থাপনাকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: পথেই ২৭৫ বন্দীর মৃত্যু
কারা অধিদপ্তরের বিগত প্রায় ৫ বছরের (৪ বছর ৯ মাস) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কারাগারে বন্দীর মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- মোট মৃত্যুর সংখ্যা:৪ বছর ৯ মাসে কারাগারে বা কারা হাসপাতালে মারা গেছেন মোট ৯৩৩ জন বন্দী। অর্থাৎ, বছরে গড়ে প্রায় ১৯৬ জন বন্দীর মৃত্যু হচ্ছে।
- পথেই মৃত্যু:এই পরিসংখ্যানের মধ্যে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য হলো—কারাগার অথবা কারা হাসপাতাল থেকে বাইরের বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পথেই মারা গেছেন মোট ২৭৫ জন বন্দী।
- গড় বার্ষিক মৃত্যু:প্রতি বছর গড়ে ৫৮ জন বন্দী জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালে স্থানান্তরের পথেই মারা যাচ্ছেন, যা সময়মতো জরুরি চিকিৎসার অভাব এবং অব্যবস্থাপনারই ফল।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
চিকিৎসক সংকটের মূল কারণ
এত বিশাল সংখ্যক বন্দীর জন্য মাত্র দুজন স্থায়ী চিকিৎসক থাকার পেছনে কাঠামোগত কারণ রয়েছে:
- চিকিৎসকদের অনাগ্রহ:কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ‘প্রেষণে’ বা ‘সংযুক্ত’ হিসেবে যেসব চিকিৎসককে কারা হাসপাতালে পাঠানো হয়, তারা সেখানে থাকতে চান না।
- পদোন্নতির সুযোগ সীমিত:কারা হাসপাতালে কাজের পরিবেশ এবং পদোন্নতির সুযোগ কম থাকায় বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা এখানে দায়িত্ব পালন করতে উৎসাহিত হন না।
- প্রশাসনের জটিলতা:অনেক সময় বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাকে নন-ক্যাডার কর্মকর্তার অধীনে কাজ করতে হয়, যা তাদের পেশাগত অসন্তোষের জন্ম দেয়।
- অপর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধা:বেশিরভাগ কারা হাসপাতালেই উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স (৭৪টি কারাগারের জন্য মাত্র ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে) এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় অন্য যানবাহনে করে অসুস্থ বন্দীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ
মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, বন্দীরা রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকেন এবং তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী এবং চিকিৎসকের তীব্র ঘাটতি থাকার পরেও কারা হাসপাতালের দুরবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বন্দীদের অবহেলায় মৃত্যু হলে এর দায়ভার রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
উপসংহার
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, প্রেষণে আসা চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং কারা-হাসপাতালের অবকাঠামো ও সরঞ্জাম আধুনিকীকরণ অপরিহার্য। পাশাপাশি, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী থাকার বিষয়টিও দ্রুত সমাধান করা দরকার। অন্যথায়, চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে বন্দীদের অকালমৃত্যুর এই করুণ চিত্র অব্যাহত থাকবে।


