সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপে বাঘের আতঙ্ক: স্থানীয় জনজীবনে চরম উত্তেজনা!

প্রকাশিত: 11:04 AM, December 15, 2025

বাঘ আতঙ্ক!

খুলনা প্রতিনিধি, বিডি নিউজ নেটওয়ার্ক

ভীতি ও উদ্বেগের ঢেউ আছড়ে পড়েছে দাকোপের সুতারখালীতে

সুন্দরবনের অপার রহস্যময়তা একদিকে যেমন আমাদের জাতীয় গর্ব, তেমনই এর কোল ঘেঁষে থাকা জনপদের জন্য বয়ে আনে এক চিরন্তন উদ্বেগ। সাম্প্রতিক সময়ে সেই উদ্বেগই চরম আকার ধারণ করেছে খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের গুনারী এলাকায়। গ্রামবাসীর দাবি, গত রবিবার সন্ধ্যায় এলাকার বৈদ্যপাড়া অঞ্চলে একটি বাঘ দেখা যাওয়ার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক।

সুন্দরবন–সংলগ্ন এই অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা নতুন নয়, তবে সরাসরি বাঘ দেখার দাবি নিঃসন্দেহে এলাকাবাসীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুরারী হালদার নিশ্চিত করেছেন যে, বেশ কিছু দিন ধরেই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যাওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু পুলিন বৈদ্য নামের এক স্থানীয় ব্যক্তির বাঘ দেখার দাবির পর থেকেই ভীতি আর গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।

প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি ও স্থানীয়দের রাত জাগা পাহারা

বাঘ দেখার দাবি করা পুলিন বৈদ্য প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, রবিবার সন্ধ্যায় খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হওয়ার সময় তিনি বাঘটিকে দেখতে পান। টর্চের আলো পড়তেই দ্রুত সেটি পাকা ধানখেতের আড়ালে লুকিয়ে যায়। তাঁর ধারণা, এটি আকারে ছোট কোনো বাঘ বা বাঘের শাবক। পুলিন বৈদ্যের এই উক্তি স্থানীয়দের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এটি কোনোভাবেই বাঘডাশা (Civet) বা অন্য কোনো সাধারণ বন্যপ্রাণী নয়।

দক্ষিণ গুনারী উপেননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অনিমেশ মণ্ডল নিশ্চিত করেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই স্থানীয়রা বাঘের পায়ের ছাপের সন্দেহে আতঙ্কে ছিলেন। রবিবার সন্ধ্যায় বাঘ দেখার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এলাকাবাসী দলবদ্ধভাবে টর্চ হাতে ধানখেতে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। তবে গভীর রাত পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়েও বাঘটির কোনো সন্ধান মেলেনি, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বন বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত শুরু

এদিকে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর হয়েছে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়ার খবর এলেও তখন সুনির্দিষ্ট কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তিনি আরও জানান, গত সাত দিনে এলাকায় কোনো গবাদি পশুর (গরু, ছাগল) ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি, যা সাধারণত বাঘের উপস্থিতির একটি বড় প্রমাণ হয়। এই কারণে বন বিভাগ প্রাথমিকভাবে মনে করছে, প্রাণীটি হয়তো মেছোবিড়াল (Fishing Cat) বা বাঘডাশা হতে পারে।

ডিএফও নিশ্চিত করেছেন, পরিস্থিতি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখতে আজ (সোমবার) সকালেই বন বিভাগের একটি বিশেষ দল গুনারী এলাকায় পাঠানো হয়েছে। তারা বাঘের পায়ের ছাপসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করবেন। যদি কোনো বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি প্রমাণিত হয়, তবে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহায়তায় সেটিকে উদ্ধার করে দ্রুত নিরাপদে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে এবং মানুষের মধ্যেকার আতঙ্ক কমাতে বন বিভাগ কাজ করছে। গ্রামবাসীকে সতর্কতা অবলম্বন এবং দলবদ্ধভাবে চলাচল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে বা খাবারের সন্ধানে বাঘ বা অন্যান্য প্রাণী লোকালয়ে চলে আসা অস্বাভাবিক নয়, তবে স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।