বাগমারায় ১৮ সমিতির ৯৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও: পথে বসলো ২২০০ পরিবার

প্রকাশিত: 11:44 AM, November 19, 2025

বাগমারায় ১৮ সমিতির ৯৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও: পথে বসলো ২২০০ পরিবার

https://www.effectivecpmnetwork.com/iaby930p4?key=6afc5158429eeea2b49232e9ee38eda7

bdnewsnetwork.com

রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলায় এক ভয়াবহ সমবায় কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে এসেছে, যা প্রায় ২ হাজার ৩০০ গ্রাহকের জীবনে নেমে এনেছে ঘোর অন্ধকার। স্থানীয় ১৮টি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত আনুমানিক ৯৫ কোটি টাকা নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়েছে। পাকা ঘরের স্বপ্ন দেখা খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী—সবাই এখন নিঃস্ব।

স্বপ্নভঙ্গের করুণ কাহিনী: ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দুর্দশা

 

বাগমারা উপজেলার একডালা গ্রামের খোদেজা বেগম (৫৬) বহু বছর ধরে মানুষের বাসায় কাজ করে এবং হাঁস-মুরগি পালন করে চার লাখ টাকা জমিয়েছিলেন একটি পাকা ঘরের জন্য। বেশি মুনাফার লোভে তিনি স্থানীয় একটি সমিতিতে সেই সঞ্চয় আমানত রাখেন, এই আশায় যে মেয়াদ শেষে টাকা দ্বিগুণ হবে। কিন্তু মেয়াদ পূর্তির আগেই সমিতির কর্মকর্তারা টাকা নিয়ে গা ঢাকা দেন। খোদেজা বেগমের মতো এমন হাজারো গ্রাহকের সঞ্চয় আত্মসাৎ করেছে এই প্রতারক চক্র।

শাহানাজ নামের আরেক ভুক্তভোগী নারী জানান, তিনি ও তার স্বজনেরা মিলে ম্যাসেঞ্জার সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতিতে ৩৩ লাখ টাকা রেখেছিলেন, যার মধ্যে এক আত্মীয়ের অবসরের টাকাও রয়েছে। নিয়মিত মুনাফা দিয়ে একসময় আস্থা অর্জন করা এই সমিতি এখন মুনাফা বা আসল কোনো টাকাই ফেরত দিচ্ছে না। থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি বলে জানান তিনি।

যেভাবে চলছিল বাগমারার এই সমিতি প্রতারণার জাল

 

উপজেলা সমবায় দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাগমারায় মোট নিবন্ধিত সমিতির সংখ্যা ৩০৩টি। গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে দুই দফায় ৬৮টি সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে এবং প্রায় ১০০টি সমিতিকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ২০১৮ সালের পর থেকে সমিতির নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি এই সুযোগ গ্রহণ করে।

সহকারী পরিদর্শক তাসনিমুল হক জানান, ২০১৯ সালে পাইলট প্রকল্পের অধীনে উপজেলা সমবায় দপ্তর থেকে নিবন্ধিত সমিতিগুলোর অধিকাংশই এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত। প্রতারক চক্র বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে আমানত সংগ্রহ করত। তারা মাসিক, ত্রৈমাসিক, বাৎসরিক বা পাঁচ বছরে দ্বিগুণ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিত। মাসিক প্রতি লাখে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা মুনাফার লোভেই কৃষক, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, শ্রমিকসহ সব শ্রেণির মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় জমা রাখে এসব সমিতিতে। গ্রাহকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি সমিতি ২৮ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে।

উধাও হওয়া রাজশাহী সমবায় সমিতি এবং আইনি পদক্ষেপ

 

চলতি বছর থেকে মুনাফা দেওয়া বন্ধ করে টালবাহানা শুরু করে সমিতিগুলো। এরপর একে একে ১৮টি সমিতির পরিচালকেরা অফিস গুটিয়ে গা ঢাকা দেন। উধাও হওয়া সমিতিগুলোর মধ্যে রয়েছে আত তিজারা, আলোর বাংলা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, আল–বায়া, তোরা ফাউন্ডেশন, মোহনা সমাজকল্যাণ সংস্থা, স্বচ্ছতা গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, আঁত তাবারা শিক্ষক কল্যাণ সমিতি, আমেনা ফাউন্ডেশন, নদী সঞ্চয় ঋণদান সমিতি, চানপাড়া সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, সাফল্য গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, সোনালী সকাল ঋণদান সমিতি, সালেমা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, ম্যাসেঞ্জার সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি, জনপ্রিয় সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি, গোল্ডেন স্টার সমিতি, অগ্রণী সমবায় সমিতি ও স্বনির্ভর সঞ্চয় ঋণদান সমিতি

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েও কোনো ফল পাননি। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা বীরেন্দ্রনাথ সরকার জানান, তিনি মোহনা নামের একটি সমিতিতে ৯ লাখ টাকা রেখেছিলেন এবং টাকা ফেরত না পাওয়ায় মামলা করেছেন। আল-বায়া সমিতির ৭০ জন গ্রাহক প্রায় চার কোটি টাকা হারিয়ে মামলা দায়ের করেছেন।

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে এবং পুলিশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।

দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা: বাগমারা সমবায় কেলেঙ্কারি

 

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা কাউসার আলী এই প্রতারণার দায় আংশিকভাবে অস্বীকার করে বলেন, বার্ষিক প্রতিবেদন পরিচালকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয় এবং সমিতিগুলো কৌশলে একাধিক সংস্থা থেকে অনুমতি নিয়ে আমানত সংগ্রহ করেছে।

তবে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, এসব সমিতির আমানত গ্রহণ ও কার্যক্রমে সমবায় নীতি মানা হয়নি। তিনি জানান, আইনগত বিষয় দেখে সমিতিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গ্রেপ্তার ও আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন পরিচালক লোকসানের কথা স্বীকার করলেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে না পারার কথা জানিয়েছেন। হাজার হাজার গ্রাহকের জীবনের শেষ সম্বল নিয়ে ঘটে যাওয়া এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় এখন প্রশাসনের তড়িৎ ও কার্যকর পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগীরা।


bdnewsnetwork.com-এ প্রকাশিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খবরের জন্য চোখ রাখুন।