আকাশে রহস্য! পৃথিবীর দিকে দ্রুত ধেয়ে আসছে সি/২০২৫ ভি১ (বোরিসভ) ধূমকেতু: আতঙ্ক নয়, কৌতূহল

প্রকাশিত: 5:48 PM, November 13, 2025

সি/২০২৫ ভি১ (বোরিসভ) ধূমকেতু: পৃথিবীর দিকে দ্রুত ধাবমান এক রহস্যময় মহাজাগতিক অতিথি

https://www.effectivecpmnetwork.com/iaby930p4?key=6afc5158429eeea2b49232e9ee38eda7

 

(প্রযুক্তি ডেস্ক, bdnewsnetwork.com)

মহাবিশ্বের বিশালতা যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। গ্রহাণু আর ধূমকেতুর নিরন্তর ছোটাছুটির এই মঞ্চে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন চমক। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমনই এক রহস্যময় ধূমকেতুকে চিহ্নিত করেছেন, যা বর্তমানে আমাদের সৌরজগতের মধ্য দিয়ে পৃথিবী এবং সূর্যের দিকে দ্রুত ধেয়ে আসছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সি/২০২৫ ভি১ (বোরিসভ) নামে পরিচিত এই মহাজাগতিক বস্তুটি গোটা জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে নতুন করে কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।

 

ইউক্রেনীয় আবিষ্কারকের কৃতিত্ব

 

এই নতুন ধূমকেতুটি আবিষ্কারের কৃতিত্ব যায় ইউক্রেনের ক্রিমিয়ার শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী গেন্নাদি বোরিসভের কাছে। তিনি ২০১৯ সালে প্রথম আন্তনাক্ষত্রিক বস্তু ২আই/বোরিসভ আবিষ্কার করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁর এই সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি ২ থেকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারে এর গতিপথ সংক্রান্ত তথ্য রিপোর্ট করা হয়। মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার হলো সেই আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা সৌরজগতের নতুন গ্রহাণু, ধূমকেতু ও অন্যান্য ছোট বস্তুর তথ্য সংগ্রহ, ট্র্যাকিং এবং রেকর্ডিংয়ের কাজ করে।

 

আন্তনাক্ষত্রিক নাকি সৌরজগতের নিজস্ব?

 

সি/২০২৫ ভি১ (বোরিসভ) ধূমকেতুটি আবিষ্কারের পর থেকেই এটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে। এর গতিপথ এবং বৈশিষ্ট্যের কারণে এটিকে সম্প্রতি আলোচিত আন্তনাক্ষত্রিক বস্তু ৩আই/অ্যাটলাসের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছিল। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এই দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, এই নতুন ধূমকেতুটি বাইরের আন্তনাক্ষত্রিক স্থান থেকে না এসে, সম্ভবত আমাদের সৌরজগতের মধ্যেই উৎপন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, ৩আই/অ্যাটলাস নিশ্চিতভাবে সৌরজগতের বাইরের অতিথি।

হার্ভার্ডের প্রখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী আভি লোয়েব, যিনি ৩আই/অ্যাটলাস নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন, তিনি সি/২০২৫ ভি১ (বোরিসভ)-কে ‘প্রায় আন্তনাক্ষত্রিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই মন্তব্যের কারণ হলো এর অস্বাভাবিক কক্ষপথ। ধূমকেতুটির পথ সাধারণ গ্রহ বা ধূমকেতুর সমতলের তুলনায় প্রায় ১১৩ ডিগ্রি কোণে অত্যন্ত ঝুঁকে আছে। এর গতিপথ কার্যত আন্তনাক্ষত্রিক বস্তু ৩আই/অ্যাটলাসের কক্ষপথের সঙ্গে প্রায় লম্ব। এছাড়া, এটিতে সাধারণ ধূমকেতুর মতো সাধারণত দৃশ্যমান কোনো লেজ দেখা যাচ্ছে না, যা এর রহস্যময়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

কবে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে?

 

মহাকাশে এর গতিবিধি ট্র্যাকিং করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন:

  • পৃথিবীর নিকটতম অবস্থান: ধূমকেতুটি ১১ নভেম্বর পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে।
  • সূর্যের নিকটতম অবস্থান (পেরিসৌরব): এটি আগামী ১৬ নভেম্বর সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বিন্দুতে পৌঁছাবে।

যদিও এটি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে, তবুও এতে কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। পৃথিবীর নিকটতম অবস্থানে এটি চাঁদ থেকে প্রায় ২৭০ গুণ দূরে, অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ৪ লাখ মাইল ($6.4 \times 10^7$ মাইল) দূরত্ব বজায় রেখে চলে গেছে। এটি মহাজাগতিক দূরত্বে একটি নিরাপদ ব্যবধান।

 

পর্যবেক্ষণের সুযোগ

 

সাধারণ মানুষের জন্য এই বিরল মহাজাগতিক অতিথিকে খালি চোখে দেখা বেশ কঠিন হবে। এর তীব্রতা কম হওয়ায় এটিকে দেখতে হলে অবশ্যই শক্তিশালী দুরবিন বা টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে হবে। বর্তমানে ধূমকেতুটি রাতের আকাশে কন্যা রাশিতে (Virgo constellation) অবস্থান করছে।

সি/২০২৫ ভি১ (বোরিসভ) ধূমকেতুটি প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব প্রতি মুহূর্তে নতুন কিছু উন্মোচন করছে। এই ধরনের আবিষ্কার কেবল কৌতূহলই বাড়ায় না, বরং সৌরজগতের উৎপত্তি ও গঠনে ধূমকেতুর ভূমিকা সম্পর্কে নতুন তথ্য অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করে। এই রহস্যময় ধূমকেতুর গতিপথের ওপর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিবিড় নজর রাখছেন, যা ভবিষ্যতে আরও নতুন তথ্যের জন্ম দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।