
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ [bdnewsnetwork.com]
এই মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টির জন্য একটি অনিবার্য সত্য হলো—মৃত্যু। মানুষ হোক বা জিন, উদ্ভিদ হোক বা পশু-পাখি—প্রত্যেক জীবকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, জীবনের সমাপ্তি এবং রুহ বা আত্মা গ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সম্পন্ন করেন একজন বিশেষ ফেরেশতা, যিনি মালাকুল মাওত বা মৃত্যুর ফেরেশতা নামে পরিচিত। তাকে আজরাইল (আ.) নামেও অভিহিত করা হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই চিরন্তন সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “জমিনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল, আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা।” (সূরা আর রহমান, আয়াত: ২৬-২৭) এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতিত সকল সৃষ্টি—মানুষ, জিন, এমনকি ফেরেশতাকুলও—নশ্বর এবং তাদের নির্ধারিত সময় শেষ হলে তারা মৃত্যুর সম্মুখীন হবে।
সাধারণভাবে, আমরা মালাকুল মাওতের দায়িত্ব বলতে মানুষের রুহ কবজ করার ঘটনাকেই বুঝি। তবে, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, যেহেতু কোরআন সকল প্রাণী (কুল্লু নাফসিন) কে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের কথা বলেছে, তাই প্রাণীকুলের জীবনাবসানও আল্লাহ তাআলার বিশেষ নির্দেশনায় এবং নিয়মের অধীনেই ঘটে।
আল-কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতিটি আত্মার জীবনাবসানের জন্য আল্লাহ তাআলা মালাকুল মাওতকে (মৃত্যুর ফেরেশতা) মনোনীত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।” (সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১১)
মুফাসসির ও ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, মালাকুল মাওত বা তার সহকারীদের দায়িত্ব শুধুমাত্র মানুষের রুহ কবজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সকল প্রাণীর রুহ কবজের প্রক্রিয়ার দেখভাল করাই তার মূল কাজ। এই বিশাল দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য তার অধীনে আরও অসংখ্য সহকারী ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন। এই সহকারীরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মালাকুল মাওতের তত্ত্বাবধানে সকল প্রাণীর রুহ কবজের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে থাকেন।
যদিও প্রাণীদের রুহ কবজের প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ কোরআন বা সহীহ হাদিসে বিস্তারিতভাবে আসেনি, তবে পণ্ডিতরা এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, প্রাণিজগতের মৃত্যুও ঐশ্বরিক নিয়মের অধীন। ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর মতো অনেক ইসলামি স্কলার বলেছেন যে, প্রাণীদের ক্ষেত্রেও যখন আল্লাহ তাআলা মৃত্যু ঘটাতে চান, তখন মালাকুল মাওত বা তার সহকারী ফেরেশতারাই সেই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যেহেতু সমস্ত মৃত্যুর উৎস এক, তাই প্রাণীদের মৃত্যুও মহান আল্লাহর সেই নির্দিষ্ট ফেরেশতার মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
এছাড়াও, কিয়ামতের পূর্বে ইসরাফীল (আ.)-এর প্রথম ফুঁকের পর যখন সকল সৃষ্টির মৃত্যু হবে (ফেরেশতাকুল সহ), তখন একমাত্র আল্লাহ তাআলা জীবিত থাকবেন। এরপর আল্লাহ তাআলার আদেশে যখন মালাকুল মাওতেরও মৃত্যু হবে, তখন আল্লাহই হবেন একমাত্র চিরঞ্জীব।
সুতরাং, ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মালাকুল মাওত বা তার সহকারী ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশে শুধুমাত্র মানুষ নয়, বরং জমিনের উপর বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রুহ কবজ করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এটি সেই বৃহত্তর ঐশ্বরিক ব্যবস্থার অংশ, যেখানে সকল সৃষ্টির শুরু ও শেষ আল্লাহ তাআলার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।