
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, সকাল
এএফপি ও নিজস্ব প্রতিবেদক: বিডিনিউজ নেটওয়ার্ক ডট কম
এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে নতুন করে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ভারী গোলাবর্ষণ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কান্দাহার প্রদেশের স্পিন বোলডাক এবং পাকিস্তানের চামান সীমান্ত এলাকায় এই সংঘাত হয়। উভয় পক্ষই বিনা উসকানিতে প্রথমে গুলি চালানোর জন্য একে অপরের ওপর দায় চাপিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতির এই ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার গভীর রাতে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় এবং স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে তুমুল গোলাগুলি শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে। সংঘর্ষে দুই পক্ষই হালকা ও ভারী আর্টিলারি ব্যবহার করেছে বলে জানা যায়।
আফগানিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ তাঁর এক্সে দেওয়া পোস্টে দাবি করেন, পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমে কান্দাহারের স্পিন বোলডাক জেলা লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যার জবাবে আফগান বাহিনী পাল্টা জবাব দেয়।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের একজন মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানান, আফগান বাহিনীই চামান সীমান্তে বিনা উসকানিতে প্রথম গুলিবর্ষণ করেছে। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, "আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তাৎক্ষণিক, উপযুক্ত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন যে পাকিস্তান সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কান্দাহারের তথ্য বিভাগের প্রধান আলী মোহাম্মদ হকমাল এএফপিকে জানান, পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া মর্টারের গোলা সাধারণ মানুষের বাড়িতে আঘাত হেনেছে। তবে, উভয় পক্ষ গোলাগুলি বন্ধ করতে রাজি হওয়ায় পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই সংঘাতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে, যা বর্তমানে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ।
ইসলামাবাদ কাবুলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, বিশেষ করে পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি)-কে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করছে। টিটিপি প্রায়ই পাকিস্তানে বড় ধরনের হামলা চালায়। তবে, আফগান সরকার বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
গত অক্টোবরেও দুই দেশের মধ্যে এক প্রাণঘাতী সংঘাতে ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত ও কয়েক শ আহত হয়েছিলেন। কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, সীমান্তে মাঝেমধ্যেই এই ধরনের গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। এমনকি দোহা ও ইস্তাম্বুলে কয়েক দফা আলোচনার পরও কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তাছাড়া, গত মাসে কাবুল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলার অভিযোগ করেছিল, যেখানে ৯ জন শিশুসহ মোট ১০ জন নিহত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। যদিও ইসলামাবাদ ওই অভিযোগ অস্বীকার করে। এই ধরনের ঘন ঘন সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগই নির্দেশ করে যে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি।
সর্বশেষ এই সংঘাত প্রমাণ করে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতি হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য উভয় পক্ষকে অবিলম্বে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।