
জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবনে। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ বাধ্য হচ্ছে অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত হতে। যদিও রাজধানী ঢাকা দীর্ঘকাল ধরে অভিবাসন চাপের প্রধান কেন্দ্র ছিল, বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের উপজেলা সদর এবং ছোট শহরগুলোই এসব জলবায়ু উদ্বাস্তুদের নতুন জীবন ও জীবিকার প্রথম গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে দেশের উপকূলীয় নগরাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে অতিরিক্ত জনচাপ, যা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (SDG), বিশেষ করে টেকসই নগর অর্জনের পথে এক ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করছে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরের গাবুরার মতো এলাকাগুলো প্রতি বছরই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিরীন খাতুনের মতো অসংখ্য পরিবার সবকিছু হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের কুকরালি বা ইটেগাছা বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু শহরে এসেও তাঁদের দুর্দশা শেষ হচ্ছে না। সাতক্ষীরা পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ১.১৩ লক্ষ জনসংখ্যা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২ লক্ষের বেশি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা এই মানুষেরা শহরের ৪৭টিরও বেশি বস্তিতে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আজাদ হোসেনের মতে, ভালো থাকার আশায় শহরে এলেও বস্তিগুলো বর্ষার সময় ছয় মাস পর্যন্ত জলমগ্ন থাকে। বসবাসের পরিবেশের চরম অবনতির পাশাপাশি কাজেরও তীব্র অভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এই মানুষগুলো শহরে এসেও দুবেলা পেট ভরে খেতে পারছেন না। একই চিত্র খুলনা নগরীসহ অন্যান্য উপকূলীয় শহরেও।
এই ব্যাপক অভিবাসন শুধু বস্তিবাসীর জীবনকেই দুর্বিষহ করে তুলছে না, এটি উপকূলীয় শহরগুলোর দুর্বল অবকাঠামোকেও ভেঙে ফেলছে। সাতক্ষীরা শহরে নারকেলতলা থেকে নিউমার্কেট মোড় পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। শহরের প্রধান সড়ক শহীদ নাজমুল সরণির অবস্থাও করুণ, যেখানে খোয়া উঠে যাওয়ায় যান চলাচল প্রায় অসম্ভব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম দৈন্যদশা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরগুলোর পরিবেশ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৭১ লক্ষের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি দেশের জন্য একটি বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একদল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণা ‘ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট ইন লো লাইং কোস্টাল সিটিজ অব বাংলাদেশ ইউজিং অ্যানালিটিক হায়ারার্কিক প্রসেস’-এ দেশের ২২টি উপকূলীয় শহরের ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ুজনিত, পরিবেশগত এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের এক জটিল সমস্যার মুখোমুখি। এই শহরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা গভীর হতে পারে, সেই উপেক্ষিত দিকটিই গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে বহুমাত্রিক বিপদঝুঁকি মূল্যায়ন, জলবায়ু-সহনশীল জীবিকাব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর শাসনব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। উপকূলের এই শহরগুলোর প্রতি এখনই বিশেষ মনোযোগ না দিলে অদূর ভবিষ্যতে এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে।